দুঃখ করো না, বাঁচো – নির্মলেন্দু গুণ

দুঃখকে স্বীকার করো না, –সর্বনাশ হয়ে যাবে ।
দুঃখ করো না, বাঁচো, প্রাণ ভ’রে বাঁচো ।
বাঁচার আনন্দে বাঁচো । বাঁচো, বাঁচো এবং বাঁচো ।
জানি মাঝে-মাঝেই তোমার দিকে হাত বাড়ায় দুঃখ,
তার কালো লোমশ হাত প্রায়ই তোমার বুক ভেদ করে
চলে যেতে চায়, তা যাক, তোমার বক্ষ যদি দুঃখের
নখরাঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়; যদি গলগল করে রক্ত ঝরে,
তবু দুঃখের হাতকে তুমি প্রশ্রয় দিও না মুহূর্তের তরে ।
তার সাথে করমর্দন করো না, তাকে প্রত্যাখান করো ।
বাকি অংশ

বসন্ত বন্দনা – নির্মলেন্দু গুণ

হয়তো ফুটেনি ফুল রবীন্দ্রসঙ্গীতে যত আছে,
হয়তো গাহেনি পাখি অন্তর উদাস করা সুরে
বনের কুসুমগুলি ঘিরে। আকাশে মেলিয়া আঁখি
তবুও ফুটেছে জবা,—দূরন্ত শিমুল গাছে গাছে,
তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্ত পথিক।

এলিয়ে পড়েছে হাওয়া, ত্বকে কী চঞ্চল শিহরন,
মন যেন দুপুরের ঘূর্ণি-পাওয়া পাতা, ভালোবেসে
অনন্ত সঙ্গীত স্রোতে পাক খেয়ে, মৃত্তিকার বুকে
নিমজ্জিত হতে চায়। হায় কি আনন্দ জাগানিয়া।

এমন আগ্রাসী ঋতু থেকে যতই ফেরাই চোখ,
যতই এড়াতে চাই তাকে, দেখি সে অনতিক্রম্য।
বসন্ত কবির মতো রচে তার রম্য কাব্যখানি
নবীন পল্লবে, ফুলে ফুলে। বুঝি আমাকেও শেষে
গিলেছে এ খল-নারী আপাদমস্তক ভালোবেসে।

আমি তাই লঘুচালে বন্দিলাম স্বরূপ তাহার,
সহজ অক্ষরবৃত্তে বাঙলার বসন্ত বাহার।

১২-২-৮৫ – নির্মলেন্দু গুণ

নিজের জলেই টলমল করে আঁখি,
তাই নিয়ে খুব বিব্রত হয়ে থাকি।

চেষ্টা করেও রাখতে পারি না ধরে-
ভয় হয় আহা, এই বুঝি যায় পড়ে।

এমনিই আছি নদীমাতৃক দেশে,
অশ্রুনদীর সংখ্যা বাড়াবো শেষে?

আমার গঙ্গা আমার চোখেই থাক্‌
আসুক গ্রীষ্ম মাটি-ফাটা বৈশাখ।
বাকি অংশ

স্বয়ম্ভূ সুন্দর – নির্মলেন্দু গুণ

যতক্ষণ জেগে থাকি, দরোজাটা বন্ধ করি না।
কেবলই মনে হয় কেউ একজন আসবে।
আমার প্রত্যাশায় এমন একজন নারী আছে,
কোনো শিল্পী যাকে আঁকতে পারেনি।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি,
আঁরি মাতিস,
পাবলো পিকাসো অথবা যামিনী রায়,
কেউ-ই আঁকতে পারে নি তাকে।
মারকন্যার উদাস দৃষ্টির মধ্যে মুহূর্তর জন্য
আমি তাকে মূর্ত হতে দেখেছিলাম খাজুরাহে।
ব্যর্থ শিল্পী, আমার বাবার আঁকা একটি জলরঙ
ছবির ভিতরে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম তার
পেছন ফিরে তাকানোর উদ্দীপক সলজ্জ ভঙ্গিটি।
যদিও আমি জানি যে, সে-ছবির মডেল ছিলেন
আমার সিক্তবসনা মাতা, আমার জননী।
বাকি অংশ

পদ্ম মৃত্যু – নির্মলেন্দু গুণ

পদ্ম ফোটানোর জন্যে একটা পুকুর কেটেছিলাম ।
ঝর্নার মতো জল উঠবে তার পাতাল থেকে ।
ভালোবেসে নিজের হাতে কেটেছি হাজার কোয়া মাটি ।
কিন্তু পাতাল চিরে উঠে আসেনি স্বচ্ছতোয়া নদী,
দু’কূল ছাপিয়ে উঠেনি স্বর্গীয় মদে ফেনা ।

দিন শেষে দেখি পদ্মের মৃণালে শুধু মৃত্যু ফুটে আছে ।